শরৎচন্দ্র ‘’'পথের দাবী” তে লিখছেন,
“ডাক্তার নিজেও হাসিয়া বলিলেন, তার কারণ, ওঁর মধ্যে দুটো সত্তা আছে অপূর্ববাবু। একজন শশী, আর একজন কবি। এইজন্যই একের মুখের কথা অপরের মনের কথায় গিয়ে ধাক্কা দিয়ে এমন বেসুরার সৃষ্টি করে। একটু থামিয়া বলিলেন, বহু মানবের মধ্যেই এমনি আর একজন নিভৃতে বাস করে। সহজে তাকে ধরা যায় না। তাই, মানুষের কথার ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাব-মাত্রই তার কঠোর বিচার করলে অবিচারের সম্ভাবনাই থাকে বেশী।”
রবীন্দ্রনাথ, ‘'কালান্তর” গ্রন্থে লিখছেন,
"আমার এই ষাট বৎসরের অভিজ্ঞতায় একটি কথা জেনেছি যে, কপটতার মতো দুঃসাধ্য অতএব দুর্লভ জিনিস আর নেই। খাঁটি কপট মানুষ হচ্ছে ক্ষণজন্মা লোক, অতি অকস্মাৎ তার আবির্ভাব ঘটে। আসল কথা, সকল মানুষের মধ্যেই কমবেশি পরিমাণে চারিত্র্যের দ্বৈধ আছে। আমাদের বুদ্ধির মধ্যে লজিকের যে কল পাতা, তাতে দুই বিরোধী পদার্থকে ধরানো কঠিন বলেই ভালোর সঙ্গে যখন মন্দকে দেখি তখন তাড়াতাড়ি ঠিক করে নিই, এর মধ্যে ভালোটাই চাতুরি।"
আজকাল সোশ্যালমিডিয়ায় যারা ট্রোলজীবী তাদের প্রধান উপজীব্যই হচ্ছে কোনো মানুষের ব্যবহারে অসঙ্গতি বা ইনকনসিস্টেন্সি দেখিয়ে তাকে হাস্যাস্পদ করে তোলা। এখন প্রতি মুহূর্তের কথা, ব্যবহার ভীষণভাবে ক্যামেরাবন্দী হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষের চরিত্রের এই স্বাভাবিক দিকটাও ভীষণভাবে প্রকট হচ্ছে। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে মানুষের চরিত্রের এই কন্ট্রাডিকশানকে অস্বীকার করার মত হিপোক্রেসি আর দুটো নেই। ট্রোলের মিথ্যাটা সেখানেই।
যারা শুধুই ধর্মগ্রন্থ পড়ে, এবং ক্রমে একটা সংকীর্ণ, ভীরু, শুচিবাইগ্রস্ততায় ভোগে তারা কিছুতেই কোনো চরিত্রের মধ্যে এই কন্ট্রাডিকশানকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না, ফলে অসম্ভব দোষদর্শী হয়ে পড়েন, বিশ্বসংসারে সবাইকে কপট মনে হয় আর নিজের মধ্যের এ কনট্রাডিকশানকে স্বীকার করেন না, ফলে নয় ভণ্ড নয় বিকারগস্ত হয়ে পড়েন।
ধর্মের বই তাই শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে মিথ্যা দর্শনের উপর দাঁড় করিয়ে অহর্নিশি স্বাভাবিক জীবনকে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। অন্যদিকে সৎসাহিত্য মানুষের চরিত্রের এই দ্বৈততার বাস্তবকে সামনে এনে তাকে সহজ করে।
মজার কথা হল আমরা ব্যক্তিগত জীবনে বা বাস্তবের জীবনে যতই এই অসামঞ্জস্যকে স্বীকার করে নিই না কেন, সোশ্যালমিডিয়ায় এসেই সেই একদেশীতাকেই পরম ধর্ম প্রকারান্তরে স্বীকার করে, সবাইকে নানা ক্যাটাগরিতে ট্যাগ করে তার বিন্দুমাত্র দ্বৈত আচরণকে তিলকে তাল বানিয়ে বিষাক্ত অমানবিক পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেলি।