সাদা থানটা হঠাৎ আসা বিকেলের ঝড়ে কোথায় যে উড়ে পড়ল। কালী তার মস্ত স্থূল শরীরটা নিয়ে এ পাড়া, ও পাড়া সারাটা সন্ধ্যে খুঁজে বেড়ালো। দুদিন আগেই কিনেছে। বুকে লাগে না?
উদ্বাস্তু কলোনীর গলিগুলোতে নতুন আলো এসেছে। কালী জানে ঝড়ের রাতে আলো জ্বালে না। তার ছিঁড়ে বিপদ হতে পারে। কিন্তু সাদা থানটা কি তবে গঙ্গার দিকে উড়ে গেল?
কালীর বয়েস হয়েছে। চলতে ফিরতে কষ্ট। গায়ের রঙের জন্য তার নাম কালী। ওই যে, বড় ইলেকট্রিক পোস্টের উপর গিয়ে পড়েছে সাদা থানটা। কালীর কান্না পেয় গেল আনন্দে। পরক্ষণেই মনে হল, কী করে পেড়ে আনবে? ওই উঁচু মন্দিরের মত পোস্ট। ওই দিয়ে নাকি শহরে কারেন্ট যায়। সাদা থান তারই গায়ে আটকিয়ে।
কালী রাস্তার উপর থেবড়ে বসল। ফাঁকা রাস্তা। মেঘ কেটে যাচ্ছে। তারা উঠছে এক এক করে। থানটার প্রান্ত উড়ছে হাওয়ায়। কালী ভাবল, কী হল? কারোর কি বস্ত্রহরণ হল স্বর্গে? কৃষ্ণ কি শাড়ি যোগাতে পারছে না আর। তাই সাদা থানটা চাই তার? তারার উপরে আকাশ। আকাশের উপরে স্বর্গ। স্বর্গের উপরে কী? সাদা থানের আড়ত? নাকি শাঁখা সিঁদুর দেওয়া লাল পাড় শাড়ি সাজানো থরে থরে। মেঘ বৃষ্টি রোদ, দিন রাত, কী না হয় আকাশে। সাদা থানের সঙ্গে লাল পেড়ে শাড়ির জট লেগে যায়? বিদ্যুৎ চমকে ওঠে? শাপ দেয় ঋষি মুনিরা?
কালী পাশ ফিরে শুলো রাস্তায়। যেদিকে থান উড়ছে সেদিকে তার মুখ। খিদে তেষ্টা রাগ সুখ বাসনা আগুন কীসে না পুড়েছে কালী। পাপে পুড়তে সুখ লেগেছে। পুণ্যে জ্বলেছে বিতৃষ্ণায়। এমন একজন মানুষের থানের দরকার লাগল তোমার ঠাকুর! হায় হায়। কোন পাপী অভাগী স্বর্গে ন্যাংটো হয়ে ঘুরছে গো? তোমাদের ওখানে তো পুণ্যি আর পুণ্যি! মরে যাই। তাই সে মাগীর বোধায় কাপড় জুটছে না। তাই মনে পড়ল এই কালী পাপীর কাপড়। নিয়ে যাও ঠাকুর, নিয়ে যাও। আমার পাপের দান তোমায় দিলাম।
কালীর কেউ নেই। বর মরেছে। ছেলে ছেড়েছে। কিন্তু জীবনটা ছাড়েনি। কালী জীবনের এই অংশটায় এত স্বাধীনতা, এত মুক্তি.. সে কেঁদেকেটেও নিজেকে তা সামলাতে পারে না। রাতে উঠে মাথায় জল দেয়। কতবার মাঝরাতে গঙ্গা নেয়ে যায়।
ভোর হল। সূর্যের আলো পড়েছে কালীর ভিজে থানে। কী অপূর্ব লাগছে গো! যেন সদ্য ঠাকুর আমার সোনার অলঙ্কার গলায় পরে, কোমরে জড়িয়ে, পায়ে হাতে দিয়ে কালীর সাদা থানের উপর দাঁড়ালো। কী সুখ, কী সুখ গো। ওগো ঠাকুর আমার এ পাগলপারা স্বাধীনতা নিয়ে নাও। আমায় ধরো ঠাকুর, আমায় ধরো।
কালী রাস্তায় পাশ ফিরে শুয়ে। চোখ দুটো খোলা। খোলা চোখের উপর ভাসছে সাদা থানের প্রতিচ্ছবি। কাক বসেছে কালীর বাজুর উপর। নাচতে নাচতে কোমর অবধি এসে বসল। ওদিকে মাছ ভর্তি দুই বড় জলহাঁড়ি নিয়ে তপেন আসছে এদিকে। বাজারে যাবে। এই তাজা জীয়ন্ত মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে বাবুরা অফিসে যাবে, বাচ্চারা স্কুলে যাবে। শিক্ষার রণাঙ্গনে, কর্মক্ষেত্রে, ধম্মেকম্মে ধনী দরিদ্রের অসম লড়াই শুরু হবে। তপেনের ভ্যানে মাছ কিলবিল করছে আঁশটে গন্ধ জলে। তপেন দেখছে কে যেন পথ আগলে শুয়ে। শিক্ষার পথ, আপিসের পথ আগলে শুয়ে ও কে?
তপেন ভ্যান থামায়। জল স্থির হয়। মাছেরা কোলাহল থামিয়ে চুপ। কে শুয়ে? এক চুনোপুঁটি বলে, ওই দেখ, ইলেক্ট্রিক পোস্ট সাদা থানে সেজেছে। বল তো দেখি, গামলা আছে বলে আমরা আছি, নাকি আমরা আছি বলে গামলা আছে? ওই দেখ গঙ্গা। চল গড়িয়ে দিই গামলা। প্রবীণ কাতলা বলল, আগে ধর্ম, পরে জীবন। জীবন বড়, না ধর্ম বড়? সবাই চুপ করল। উত্তরটা মুখস্থ সবার। কিন্তু প্রাণস্থ না। গামলা উঠল দুলে।
তপেন ডাকল, এই বুড়ি, ওঠ….তুই কে? কাগজ আছে? আসল কাগজ, আছে? কে তুই? এই বুড়ি?
হঠাৎ উঠল ঝড়। সাদা থান উড়ে এসে ঢাকল কালীর খোলা দুটো নিষ্প্রাণ চোখ। গামলা গড়িয়ে গেল দমকা হাওয়ার ধাক্কায়। মাছেরা নামল জলে। প্রবীণ কাতলা গেল ঘাসের জঙ্গলে আটকে। ছটফট করতে করতে বলল, গামলা…গামলা….চুনোপুঁটিরা বলল, নদী নদী…..
তপেন ডাকছে…. অ্যাই….অ্যাই….
কালী সাড়া দিল না।