বাংলা নতুন বছর পড়ল ১৪৩৩। না, এই সংখ্যার সঙ্গে বেশিরভাগ বাঙালিরই কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু আবেগের সম্পর্ক আছে। আবেগ জিনিসটা মানুষের সত্যকারের পরিচয়। বুদ্ধি জিনিসটা তার অনুচর। আবেগের অনেক জাত আছে। আবেগ অনুভব থেকে জন্মায়। ক্ষুদ্র অনুভব থেকে ক্ষুদ্র আবেগ, মহৎ অনুভব থেকে মহৎ আবেগ।
এখন ফেসবুক জুড়ে আকথা-কুকথার বন্যা বইছে। স্বাভাবিক। সেই চণ্ডীমণ্ডপ থেকে এই অবধি আসার রাস্তাটায় বাইরে অনেক কিছু বদলালেও ভেতরে অনেক কিছু বদলাতে বাকি আছে এখনও। শরৎচন্দ্রের "কমল" কী আশাপূর্ণার "সত্যবতী" রা সেদিনও বিরল। আজও।
তবু আজ বছরের প্রথম দিন সেই মহান আলোকস্তম্ভের সামনে আনত হই যিনি কামারপুকুরের মত ছোট্ট বিশেষত্বহীন এক গ্রামে জন্মে , কলকাতার মত শহরে এসে, এক ছোটো ঘরে বসে বিশ্ববাসীকে শেখালেন ধর্মের বড় অনুভব কাকে বলে। বড় অনুভবের থেকে জন্মানো বড় আবেগ মানুষকে কেমনভাবে বড় করে তোলে। সে আর ডোবায় গেঁড়িগুগলি হয়ে বাঁচতে চায় না, সে সাগর খোঁজে।
ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ। এই নামেই সেদিন বহু মানুষ দূরদূরান্ত থেকে তাঁর কাছে এসে মাথা নত করেছিল। কারণ তিনি সেদিন সব ধর্মের পবিত্রবেদীর সামনে মাথা নত করেছিলেন। এমনকি সেদিনের ব্রাহ্মধর্মও তাঁর শ্রদ্ধার অর্ঘ্য থেকে বাদ যায়নি।
শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষায় হিন্দুধর্ম কী, মানবিক ধর্ম কী সে নতুন করে আজ বলার কিছু নেই। কুতর্ক, কুযুক্তি, স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মের গোলা পাকিয়ে এর দিকে ওর দিকে ছোঁড়া, এ সেদিনও ছিল, আজও আছে। এ সব, সব যুগেই থাকে। শ্রীমান মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য আসার আগেও এমনই এক ঘোর কাল এসেছিল। সেদিনও শাস্ত্র ছিল, মন্দির ছিল, বিগ্রহ ছিল, পুজা অর্চনা সব ছিল। কিন্তু মহত অনুভব ছিল না। তাই নিত্যদিন ক্ষুদ্র অনুভবের তাড়নায় বিবাদ কলহে সবার দিন কাটছিল। মহাপ্রভু এসে শিখিয়েছিলেন মহৎ অনুভব কাকে বলে। কিন্তু সেও কালে কালে ক্ষুদ্রতায় এসে ঠেকল। কয়েকটা বাহ্যিক আচারই প্রধান হতে শুরু করল।
এ যুগ ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেবের যুগ। সমন্বয়ের যুগ। আত্মত্যাগের যুগ। পরার্থ সাধনে নিজের মুক্তির পথ খোঁজার যুগ। এ মাটি শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পদ চিহ্ন অঙ্কিত মাটি। সব ধর্ম সত্য। তবে সব চাইতে বড় ধর্ম সব ধর্মের পারে গিয়ে মহত অনুভবে জীবন সার্থক করা। শ্রীরামকৃষ্ণর গল্প। মন ধোপাঘরের কাপড়, যে রঙে ছোপাবে সেই রঙেই ছুপবে। এক যাদুকরের গামলা। যে যে রঙ চাইছে তাকে সেই রঙে ছুপিয়ে দিচ্ছে। অথচ নিজে নির্গুণ, নিরাকার, নিরঞ্জন। মহতের চর্চায়, মহতের অনুভব। ক্ষুদ্রের চর্চায় ক্ষুদ্রতার অভিশাপ। "মন না রাঙায়ে কাপড় রাঙালে, কী ভুল করিলে যোগী"। মন রাঙাতে হবে। পোশাক না। শুভ নববর্ষ।