Skip to main content

 

 

হয় তো আমরা সব চাইতে ভালোবাসি মিথ। মিথোলজিগুলোকে ভালোবাসতে বাসতে আমরা মিথকে আঁকড়ে বাঁচতে শিখি। ক্রমে সেটা মিস্টিসিজম, লিজেণ্ড্রির দিকে হাত বাড়ায়। আমরা বাস্তবকে মিথের কোটিং এ ঢেকে নিই। এই অভ্যাসগুলো এমন অজান্তেই আমাদের সমষ্টিগত অবচেতনে এসে গেছে যে এগুলো নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হয় না আমাদের। আমাদের ডাক্তার, রাজনৈতিক ব্যক্তি, ক্রিকেটার, অভিনেতা, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, লেখক প্রভৃতি সবাইকে ঘিরেই চলে মিথ বানানোর অভ্যাস। অজান্তেই তৈরি করি। অন্যকেও তৈরি করতে সাহায্য করি। বাস্তবকে যে একেবারে উপেক্ষা করতে হয় তার জন্য তা নয়। কিন্তু একেবারে কেঠো বাস্তবে আমাদের চিত্ত রঞ্জিত হয় না। আমরা বাস্তবের চাইতে আরেকটু বেশি কিছু যোগ করি। মিথ। তারপর তা গ্রহণযোগ্য হয় আমাদের। সেই পাশাখেলার কথা। কৌরবপক্ষ যখন বুঝল যে সরাসরি খেলায় পাণ্ডবদের সঙ্গে এঁটে ওঠা যাবে না, তখন শকুনির ছলে, বলে, কৌশলে তারা রাজা হল। আর পাণ্ডবরা গেল বনে। তারপর শ্রীকৃষ্ণ এলেন। যুদ্ধটুদ্ধ অনেক কিছু হল। কিন্তু সেই ছল করে পাশা খেলা কেন হল বলে কোনো বিচারসভা বসল? না। বরং যুদ্ধের তার ফয়সালা করার চেষ্টা হল। সেখানেও অভিমন্যু বধ, দ্রৌপদীর ছেলেদের বধ, শ্রীকৃষ্ণের অশ্বত্থামা হত্যার খবর জানানোয় কূটনীতি ইত্যাদি ইত্যাদি তো আছেই না। এসবই মিথ। আবার বাস্তব। এমনভাবেই মিথে আর বাস্তবে আমাদের সব কিছু এমন ঘেঁটে আছে যে আমরা মিথ ছাড়া বাস্তবকে নিতে পারি না, আবার বাস্তব ছাড়া মিথকেও না। এবার ছাড়াও আঁশ।

এসব কথা কেন লিখলাম? আসলে শরৎবাবুর চিঠিগুলো পড়ছিলাম। পথের দাবী নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তো তাঁর মতবিরোধ ইত্যাদি ছিলই। আচ্ছা পথের দাবীর ডাক্তারবাবুও তো এক মিথ ঘেরা পুরুষ না? সাহেবরা সে বই নিষিদ্ধ করেছিল। এই তো একশো বছর হল সে সব কাণ্ডের। কিন্তু ভারতকে কে বেশি চিনেছিল, গোরা? কমল? ডাক্তারবাবু? নিখিলেশ? বিপ্রদাস? নাকি কেউই এই মিথের কুয়াশা থেকে বেরোতে পারেনি? লুম্বিনীর নাস্তিক বুদ্ধ অবশেষে ভাগবতের দশাবতারের বুদ্ধ হয়েই ভারতে থেকে গেলেন, সেও কি মিথের জন্যেই? আমাদের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম, সিনেমা এ সবই তো মিথ বানানোর কারখানা। এক এক যুগে এক এক জনের মিথ বানিয়ে চলেছে। তাই কি যাদের নিয়ে মিথ বানাতে অসুবিধা, কারণ তারা এতই বাস্তববাদী বলে, তারা এত জনমানসের আড়ালে? এত অচর্চিত? কেন হল এটা? মিথ, মিস্টিসিজম মিশে বাস্তব কী করে এমন হালকা হয়ে গেল? অবশেষে প্রোপাগাণ্ডা আর তুতু ম্যায়ম্যায় করে সব কালের ঘূর্ণিতে হারিয়ে গেল। এক মিথ যায় তো আরেক মিথ আসে। কেন? সে কি প্রাচ্যের চিন্তাধারায় সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল, লক, কান্ট, হিউম, রলস, ডিউই, রাসেল আসেননি বলে? কিন্তু চাণক্য, চার্বাক? আর বৌদ্ধদের মধ্যে বিশেষ করে নাগার্জুন? নাকি সেগুলো মিথের কুয়াশা সরিয়ে আমাদের চিত্তে জায়গা পায়নি? কে জানে? চিরকালই কি আমরা এমন মিথের আবহে বাঁচব? বাস্তবের দুনিয়ায় অগ্রণী ভূমিকা নেব না কঠোর বাস্তবকে যুক্তির বিশ্লেষণে ভেঙে? ওদের থেকে হাত পেতে নিয়েই যাব শুধু? দাগই বুলিয়ে যাব শুধু? আর খালি বলব, জানো না কারা আমরা?