Skip to main content

 

003.jpg

ফ্লাইওভারের একদিকে একটা বড় দীঘি। আরেকদিকে যতদূর চোখ যায় সবুজ। বিকেলের রোদটা নরম হয়েছে এসেছে। সূর্য আজকের মত এই গোলার্ধের থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফ্লাইওভারের একটা ধারে দাঁড়িয়ে আছি। ক্ষিপ্র গতিতে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে এদিক থেকে ওদিক। মাঝে মাঝেই তাদের হর্নের আওয়াজে চমকে উঠছি। আবার চোখ ফিরে যাচ্ছে দীঘির জলের দিকে, যেখানে পশ্চিম আকাশের রং পা ডুবিয়ে বসে আছে।

মানুষের প্রাণধারণ করতে খাদ্য লাগে, জল লাগে, বাতাস লাগে, শরীরের কিছু সমীকরণ লাগে। কিন্তু বাঁচতে? এর চাইতে বেশি কিছু লাগে। বিশ্বাস। আমি কি যে অর্থে আমি বেঁচে থাকতে চাই সে ভাবে বেঁচে আছি? আমি কি সুখী? আমি মানসিকভাবে নিজেকে উজ্জীবিত রাখতে পারছি? অনেক কিছুই আছে যা আমার হাতে নেই, অথচ তারা আমার জীবনের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে, প্রভাবিত করছে, এ সত্য। তাদের নিয়ে ভেবে লাভ নেই। কিন্তু বাদবাকি যা কিছু? বা যতটুকু?

বিশ্বাসের কথা বললাম। বিশ্বাস তো কত ধরণের হয়। কোনো বিশেষ ধর্মমতে বিশ্বাস। কোনো মানুষের ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বা মাধুর্যে বিশ্বাস। কোনো নৈর্ব্যক্তিক তত্ত্বে বিশ্বাস। কোনো ধাতুতে বা শিকড়ে বা কোনো কর্মকাণ্ডে বিশ্বাস। কোনো তীর্থ বা দেবালয়ে বিশ্বাস। কোনো গ্রন্থের অভ্রান্ততায় বিশ্বাস। জ্যোতিষ গণনায় বিশ্বাস। ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এর মধ্যে কতগুলো বিশ্বাস আমার এই সময়ের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, তথ্যের সঙ্গে তালমিল খেয়ে সত্যি সত্যিই আমার মধ্যে জীবন্ত? যে ধর্মে, যে পরিবারে, যে পরিবেশে জন্মেছি তার একটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব তো আছেই আমার বিশ্বাসের উপর। ছেড়েও দিতে পারছি না আবার সবটা বিবেকেবুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে স্বীকার করেও নিতে পারছি না, এ তো আছেই। কিন্তু এমন কী থাকতে পারে যা আমার সব চেতনার বর্তমান পরিস্থিতির সাথে নিজেকে টিউন করে নেবে? হয় এমন কোনো বিশ্বাস?

আছে। মনের গতিকে আনন্দের অভিমুখী করি তুলি যদি, তবে কী হয়? এক লহমায় সব ভার ভেসে যায়। সব গ্লানি, বিষাদ ঘুচে যায়। কিন্তু আনন্দকে পাব বললেই তো পাওয়া যায় না। আনন্দকে চিনব কী করে? সে কেন সুখের থেকে আলাদা? সে কেন কোনো বাসনা চরিতার্থ হওয়ার উত্তেজনা থেকে আলাদা? সে কেন সত্যের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের বানানো কৃত্রিম জগতের মধ্যে জন্মানো আত্মসুখ থেকে আলাদা? সে কেন ঈর্ষাজাত, বৈরিজাত সুখ থেকে আলাদা? সে কেন কোনো কারণ ছাড়াই আমার? আবার কোনো কারণ ছাড়াই আমার নয়?

আনন্দ সত্য অভিমুখী। তাই, আনন্দ পাওয়া যায় না। আনন্দ হওয়া যায়। সত্যকে পাওয়া যায় না। সত্য হওয়া যায়। তথ্যকে পাওয়া যায়। সত্যকে হতে হয়। বুদ্ধি সত্য হয়ে না উঠলে সত্য বলে কিছু নেই। তথ্য আছে। তেমন নিজে আনন্দময় হয়ে না উঠলে আনন্দ বলে কিছু নেই। সুখ আছে।

এ আনন্দ, এ সত্য হয়ে ওঠার প্রথম শর্তই হল অভিমানহীনতা। কিন্তু অভিমান যাও বললেই তো চলে যায় না। তার জন্য ডাক পড়ে প্রেমাস্পদের। প্রেম ছাড়া অভিমান যায় কই? প্রেম ছাড়া প্রত্যয় হয় কই? কিন্তু প্রেম কি পাওয়া যায়? না। একই উত্তর, প্রেম হওয়া যায়। পাওয়া যায় না। যেমন যে গান কানে শুনি, সে সুখ। কিন্তু যে গান ভেতরে বেজে ওঠে, সে আনন্দ। সারাটাদিন ফিরিয়ে ফিরিয়ে গাইছি। সেই আনন্দ। প্রেম জন্মিয়ে আনন্দ। পেয়ে নয়।

আসলে প্রেম, সত্য, আনন্দ, চেতনা ও সবই একই কথার প্রতিশব্দ। অস্তিত্বের অস্তিত্ব। কিন্তু এ পাওয়ার জিনিস নয়। হওয়ার জিনিস। জল যেমন জলকে পায় না। বাতাস যেমন বাতাসকে পায় না। আকাশ যেমন আকাশকে পায় না। জলকে জল হয়ে উঠতে হয়। বাতাসকে বাতাস হয়ে উঠতে হয়। আকাশকে আকাশ হয়ে উঠতে হয়। তেমনই জীবনকে জীবন হয়ে উঠতে হয় আনন্দে। কী ভাবে?

কোনো ভাবে নেই। বরং অভাবে। যা আমার আনন্দের বিরোধী তাকে দূর করে দিয়ে। গোটা সংসার আমার আনন্দের বিরোধী। এত হিংসা, এত নিষ্ঠুরতা, এত মিথ্যা, এত শত্রুতা এর মধ্যে আমি আনন্দ হয়ে উঠব? তবে সোজা কথা বলো আমাকে সব ছেড়ে জঙ্গলে চলে যেতে হয়।

এর উত্তর হল, যদি তাই মনে হয় তবে তাই যাও। আর যদি মনে হয় এ সংসারে থেকেই নিজেকে ঘিরে নিজের একটা পরিমন্ডল তৈরি করে নেবে তাও হয়। সেটা কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়। তিলে তিলে সে খেলাঘর বানিয়ে নিতেই হবে। যেখানে আমি আর হাত পেতে বেড়াব না। বরং আমি নিজেই হয়ে উঠব আমার নিজের আনন্দ। আমি নিজেই যদি আমার নিজের আনন্দ হয়ে উঠি, তবে আমি সংসার থেকে যত দুঃখ পাই না কেন ধৈর্য হারাব না। ভেঙে পড়ব না। কারণ আমি এটা তখন বুঝতে পেরেছি সংসার আমাকে হাজার হাজার দুঃখের সঙ্গে কখনও বা কয়েক ছটাক সুখ দিলেও দিতে পারে, কিন্তু ব্যস, ওটুকুই। অথচ আমার ভেতর থেকে আনন্দময় হয়ে ওঠার জন্য ও বাধা হয়ে উঠতে পারে না। আমি অতটা অনাথ, নিঃসম্বল নই যতটা ভাবি নিজেকে। বাইরে বাইরে ভিখারির মত হাত পেতেই নিজের সম্বলকে দুর্বল করেছি। আর নয়। যে জিনিস আমার চিত্তে জন্ম নিলেই সব আছে, আর যে জিনিস আমার চিত্তে না থাকলে সংসারে কোথা থেকেও কিনে এনে, ছিঁড়ে এনে, কেড়ে এনে, ভিক্ষা করে এনে তা পূরণ করতে পারব না

এটা বুঝে গেলেই একটা বড় আপদ দূর হয়।