সুধারাণী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হাওড়ার সালকিয়ার একটা ছোটো ঘরে। ভাড়া বাড়িতে। দেশভাগ হয়ে যখন মানুষ আসে তখন গোটা মানুষ তো আসা সম্ভব নয়, ভাগাভাগি হয়েই আসে। সুধারাণীও লক্ষ লক্ষ নরনারীর মত ভিটেমাটি ছেড়ে এ দেশে উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিল। ধীরে ধীরে ছেলেরা দাঁড়ায়। মেয়ের বিয়ে হয়। কিন্তু সুধারাণীর ক্ষত কি পোরে? ভোরে উঠে শৌচে যাবে, শোনে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। কান্না ঠেলে আসে বুক ভেঙে। গোয়ালঘর নেই, উঠান নেই, আম জাম কাঁঠাল বড় বড় গাছগুলো নেই। টিনের চালে, পাকা ছাদে বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু সে সুর কই? সে গন্ধ কই? সে দেশেও কি বৃষ্টি হচ্ছে এখন? দুর্গাপুজোর সময় বারোয়ারি পুজোর মণ্ডপে বসে সুধারাণী। মাইক বাজছে। ঢাকঢোল সব বাজছে। কিন্তু কী যেন নেই? নিজের বৈধব্যকে দু ফালা করে নিয়ে এসেছে। আধখানা ওদেশে। আধখানা এদেশে। স্বামীর ছবি এসেছে, স্বামীর পায়ের ছাপ এসেছে। কিন্তু সোহাগ? দিনরাতের কথোপকথন? মান অভিমান? এমনকি সে শ্মশানের মাটি, ছাই? সব “থুয়ে” এসেছে সুধা।
উদ্বাস্তু অবস্থা কাটার পর জন্ম নেয় ছোটো ছোটো সংসার। কেউ সবলে দাঁড়ায়, কেউ অত সবলভাবে দাঁড়ায় না। ঈর্ষা বাড়ে। সংকীর্ণতা বাড়ে। স্বাভাবিক মনের গতি অষ্টাবক্র বাঁকে এত জটিল হয়ে দাঁড়ায় যে শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে। সুধা গ্রামেও ঈর্ষা দেখেছে, সংকীর্ণতা দেখেছে। কিন্তু শহুরে জীবনে এর রূপ ভীষণ জটিল। এত জটিল যে ঈর্ষাকেই মনে হয় কর্তব্য, সংকীর্ণতাকে মনে হয় বাস্তব বুদ্ধি। তবু এরই মধ্যে বাঁচার জায়গা করে নিতে হয়। খাবার অভাব যায়, কিন্তু জীবনের বড় একটা সুখ জলশূন্য পুকুরের মত পাঁক জমে হাঁ করে চেয়ে থাকে। সুধা সে পাঁকে নামে। পদ্মের বীজ ছড়ায়। গাছ জন্মাতে না জন্মাতে বিষ বাতাসে নষ্ট হয়ে যায়। সুধা ঈশ্বরের আসন ছোটো করতে করতে বিন্দুতে নিয়ে আসে। ঈশ্বর মানে কি কেবল বৈরাগ্য? উদাসীনতা? সে তো শূন্যের দীর্ঘশ্বাস।
সুধা যেদিন মারা যায় ছেলে পাশে বসে সিক্ত চোখে গীতা পড়েছে। জ্ঞান গেছে এসেছে। গলা শুকিয়েছে। স্মৃতি ঝাপসা হতে হতে পরিষ্কার হয়েছে। ক্ষীণ দৃষ্টিতে চারদিকে কাকে যেন খুঁজেছে। নাতিপুতি, ছেলেবউ সব আছে। কিন্তু যেখান থেকে এসবের শুরু সে মাটি, সে মানুষরা.. যারা ওদেশেই রয়ে গেল…সংসার মানে কি স্বামীপুত্র শুধু…বাকিরা?…. এসেছে তারা?
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘরে আসার আগেই সুধা চলে গেল। কাজকর্ম নিয়মমাফিক হল। সংসার আবার আগের মত চলতে লাগল। যারা সুধাকে দেখেছে, ছুঁয়েছে, কথা বলেছে তাদের সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমতে লাগল। নতুন মানুষ নতুন সমস্যা, সুখদুঃখভয় নিয়ে সংসার পাতল। সুধা যে ঘরে এ পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিল সে ঘরে এখন অত্যাধুনিক সাজসরঞ্জাম। এ ঘরে এখন শুধু এ দেশেরই কথা। এই ঘরেই একদিন দুই দেশের উপর দরদ নিয়ে একটা ভাঙা হৃদয় প্রাণধারণ করেছিল। আশা বাঁচিয়ে রেখেছিল, ভালোবাসাকে মরতে দেয়নি। সে নেই। সে কী পেল? তার জীবনের মূল্য কতটুকু? এ নিয়ে হিসাবনিকাশ করবে না কেউ কোনোদিন। বলবে, ওরকম ভাগ্য, কী এর চাইতেও কত দুর্ভাগা মানুষ আছে! নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যর জ্বালা কি বৃহৎ সংখ্যার সান্ত্বনায় যায়? সুধার কোনো ক্ষোভ ছিল না হয় তো। কিন্তু শোক তো ছিল। যে শোকে তার বয়েস এগিয়েছিল সময়ের চেয়ে দ্রুত। মানুষের বর্বরতার সাক্ষী থেকেও মানুষের উপর বিশ্বাস হারায়নি সুধা কীসের জোরে? সে জোর সুধার চরিত্রের জোর। গোটা জীবনের সুখদুঃখ, দুর্ভাগ্যকে নিজের অমলিন উদার চরিত্রের রসে জারিয়ে সুধা নিজের চারপাশে এক শান্তির পরিমণ্ডল তৈরি করে রাখতে পারত। কেউ যদি বলত, অমুক ধর্মের লোকেরা খারাপ। ওদের জন্যেই তোমার এই হল। সুধা গম্ভীর হয়ে উত্তর দিত, আমি লেখাপড়া জানি না, মুখ্যু মানুষ (কথাটা আক্ষরিক অর্থে সত্যি। সুধার অক্ষরজ্ঞান যৎসামান্যই ছিল।)। এতটা জানি মানুষকে না ক্ষ্যাপালে মানুষ নিজে থেকে ক্ষেপে যায় না। যারা ক্ষ্যাপায় তাদের আমি চিনি না, কিন্তু ভগবান তাদের ভালো চোখে দেখেন না, এ আমি জানি। আগুন নেভাতে আগুন লাগে লাগে না, জলই লাগে। সব ধর্মের লোকের তেষ্টা মেটায় জলই। সে তেষ্টা মেটানোর জলে যখন ভগবান ধর্মের ভাগ করেনি, তখন বাইরে থেকে দুটো আলাদা নাম, আলাদা ব্যাভারেই মানুষ আলাদা আলাদা হয়ে যায়? মানুষ একই হয়। আগুন যারা লাগায় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে, দোষ হয় আগুনের আর শুকনো খড়কুটোর।
এই সুধারাণী আমার আত্মীয় ছিলেন। আমার সৌভাগ্য আমি তাঁর শেষ জীবনে তাঁকে দেখেছি, তার সঙ্গে কিছুদিন থাকার সৌভাগ্য লাভ করেছি। কেতাবী শিক্ষা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, জীবিকার্জন, কৌতুহল নিবৃত্তির জন্যে যতই উৎকৃষ্ট জিনিস হোক না কেন, মনুষ্যত্বের জন্য যে কী বিষ হতে পারে তার প্রমাণ চারদিকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি। ঘরে বাইরে আগুন লাগিয়ে যারা আজ স্বার্থসিদ্ধির খেলায় নেমেছে তাদের রোধ করে দাঁড়াবে এমন সুধারাণীরা আজ আছেন কিনা জানি না। কিন্তু ক্ষেপিয়ে দিয়ে, একে অন্যের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে যারা সফলতার সংজ্ঞা খোঁজে তাদের মত দুর্বৃত্ত সংসারে ভীষণ কম। দুর্নীতির জবাব অতটা জটিল নয়, তার মাপ পরিমাপ আছে। কিন্তু দুর্বৃত্তির ক্ষতিসাধন ক্ষমতা অপরিসীম। কারণ তার ক্ষতিসাধনের হিসাব কষে ইতিহাস, ভাবীকালে বসে। আশু তাকে দেখে শত্রু বলেই চেনা দায় হয়, এমন চতুর তার ছদ্মবেশ। মানুষের পরম শত্রু অজ্ঞানতা না, দারিদ্র্য না, রোগশোকও না। মানুষের আসল শত্রু তার চিত্তে ঘুমন্ত দুর্বৃত্তির ঝোঁক। তাকে জাগিয়ে দিলে অনর্থ। সে অনর্থকালও ইতিহাসে নেই তা নয়। কিন্তু তাকে রোধ করতে যে সাধারণ বুদ্ধি লাগে, সে বুদ্ধি এক এক সময় এত দুর্লভ কেন?